Breaking News

ভীমা কোরেগাও মামলায় বন্দীদের জামিনে মুক্তি দিতে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের আর্জি

UN human rights petition to release prisoners on bail in Bhima Koregaon case

বিনীতা দত্ত

জেনেভা থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পরিষদ ভারত সরকারের কাছে বিতর্কিত ভীমা কোরেগাও মামলায় ধৃত বয়স্ক,অসুস্থ এবং অন্যান্য বন্দীদের অন্তত জামিনে মুক্তি দিতে আবেদন জানিয়েছেন গত শুক্রবার।উল্লেখ করা যেতে পারে ৮০ বছর বয়সী কবি,গায়ক,মানবাধিকার কর্মী ভারভারা রাও এবং ৮৩ বছর বয়সী আদিবাসী অধিকার কর্মী ফাদার স্ট্যান স্বামী এবং আরো ৩০০জন প্রতিবাদীকে মহারাষ্ট্র পুলিশ গ্রেফতার করে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে।

বিচারপ্রক্রিয়াও চলছে অত্যন্ত ধীর গতিতে।ভারভারা রাও স্নায়ুঘটিত রোগে অসুস্থ হয়ে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন,তিনি নাকি কাউকে চিনতে পারছেন না।অন্যদিকে,স্ট্যান স্বামী পারকিনসন রোগে গুরুতর অসুস্থ।তাঁদের নাম না করেই মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে,বন্দীদের কয়েকজন বয়স্ক এবং গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে,গতকালের ইষ্টার্ন টাইমসে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা গেছে যে,এক সক্রিয় মানবাধিকার কর্মী কাঞ্চন নানাওয়ারে(৩৭),রবিবার মহারাষ্ট্রের সাসুন জেনারেল হাসপাতালে মারা যান।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে পুলিশ মাওবাদী কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেফতার করে।তারপর তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ আরো ছয়টি মামলা দায়ের করে।তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই জটিল হৃদরোগ এবং মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়ে জমাট বাঁধার কারণে চিকিৎসাধীন ছিলেন।তাঁর জামিনের জন্য আবেদন করা হলেও তা মুম্বাই হাইকোর্টে পড়েই ছিল।বিচারব্যবস্থার ঢিলেমি ও শ্লথ গতিই তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ।

বিতর্কিত ভীমা কোরেগাও মামলায় আরো যাঁরা গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আইনজীবী,শিক্ষাবিদ,লেখক যেমন, সোমা সেন,সুধা ভরদ্বাজ,ভার্নন গঞ্জালেস,অরুণ ফ্রেরেইরা,গৌতম নভলখা এবং আরো অনেক বুদ্ধিজীবী মানুষ।তাঁরা ভারতের সবচেয়ে ঘিঞ্জি কারাগার বলে কথিত মুম্বাইয়ের তালোজা জেলে বন্দী আছেন।রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পরিষদ জানিয়েছে-আমরা ভীমা কোরেগাও মামলায় আটক সব বন্দীদের মুক্তি দিতে আবেদন জানাচ্ছি, অন্তত জামিনেও আপাতত তাদের মুক্তি দেওয়া হোক্।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে,এই পরিষদের হাইকমিশনার এর আগেও মানবাধিকার কর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে ও মত প্রকাশ করার স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন।

তিনি গত অক্টোবরে হাইকমিশনার মাইকেল বেকেলেট মানবাধিকার কর্মী এবং এন জি ও কর্মীদের আটক করা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ নিয়ে আবেদনও করেছিলেন।এন জি ও-গুলির বিদেশ খেকে আসা অর্থসাহায্যকে সীমিত ও নিয়ন্ত্রণ করাকে ভারত সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত বলে তিনি উল্লেখ করেন।রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি শনিবার ইন্দ্রমণি পান্ডেকে মানবাধিকার দপ্তরের আবেদন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

এবার ভীমা কোরেগাও-এর ঘটনার দিকে একটু আলোকপাত করা যাক্।১৮১৮ সালে মহারাষ্ট্রের পুণে জেলার ভীমা-কোরেগাও গ্রামে,ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদের সঙ্গে সেখানকার পেশোয়াদের যুদ্ধ হয়।

এই যুদ্ধে পেশোয়াদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নাকি পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও।তখন সেখানে পেশোয়াদেরই প্রাধান্য ছিল।তারা ঐ অঞ্চলের মহর নামে দলিত সম্প্রদায়ের উপর প্রায়ই অত্যাচার করতো।

তাই যুদ্ধে মহর সম্প্রদায়ের বেশ কিছু মানুষ ইষ্ট ইন্ডিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে পেশোয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জয়কে তারা পেশোয়াদের বিরুদ্ধে দলিতদের জয় বলেই মনে করে।

সেখানে এই ঘটনার স্মরণে একটি জয়স্তম্ভও গড়ে তোলা হয়।গত ২০০ বছর ধরে ১লা জানুয়ারী,এই ঘটনার স্মৃতিতে বিজয়োৎসব হয়,যাতে যোগদান করেন বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা লক্ষাধিক মানুষ।

২০১৮ সালে ১লা জানুয়ারী,২০০তম পালন বার্ষিকীতে সাংঘাতিক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে।এতে একজন যুবক মারা যান ও পাঁচজন গুরুতরভাবে আহত হন।

১৯২৭ সালের ১লা জানুয়ারী বাবাসাহেব আম্বেদকর ঐ স্থানে গিয়েছিলেন।তারপর থেকে দলিতদের কাছে স্থানটি আরো মাহাত্মপূর্ণ এবং গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে।

হিংসাত্মক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মহারাষ্ট্র পুলিশ অনেক মানুষকে ধাপে ধাপে গ্রেফতার করে।পুলিশের অভিযোগ ছিল,মাওবাদীরাই এই ঘটনার জন্য দায়ী।মাওবাদীদের উস্কানিমূলক বক্তব্যের কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে।৩রা জানুয়ারী দলিতরা মহারাষ্ট্র বন্ধের ডাক দেয়,শহরতলীর ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।নানা জায়গায় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।মিছিলের উপর হাঙ্গামা হওয়ায় ১৬ বছরের এক যুবক মারা যায়।

প্রায় ৩০০প্রতিবাদীকে গ্রেফতার করা হয়।অবশ্য বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন রকম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

ভারভারা রাও,২০১৮সালের ১৭ই নভেম্বর থেকে এবং স্ট্যান স্বামী ২০২০ সালের ৯ই অক্টোবর থেকে বন্দী অবস্থায় আছেন এবং দুজনেই বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ।রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত আইনজীবী মেরী লউলোর স্ট্যান স্বামীর প্রসঙ্গে ভারত সরকারের অনমনীয় মনোভাবের নিন্দা করেছেন।

তাঁর মতে,ভারত এমন একটা দেশ,যে কিনা মানবাধিকার রক্ষা কর্মীদেরই সুরক্ষা দেয় না।তিনি আরো জানান যে,গত নভেম্বরে স্ট্যান স্বামী এবং অন্যান্যদের মুক্তির জন্য ভারত সরকারকে তিনি আবেদন করেছিলেন।

কিন্তু ভারত সরকার তাঁর আবেদনে সাড়া দেননি।

পুলিশের মতে,সি পি আই(মাওবাদী)দল ভীমা-কোরেগাও-এর হিংসাত্মক ঘটনাটি ঘটিয়েছে এবং যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সবাই মাওবাদী দলের সক্রিয় সদস্য।

শুধু তাই নয়,বন্দীদের বিরূদ্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যার ষড়যন্ত্রের ভয়ংকর অভিযোগও আনা হয়েছে।

গত বৃহষ্পতিবার মুম্বাই হাইকোর্টে মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষে আইনজীবী ইন্দিরা জয় সিং বলেন যে,৮০ বছর বয়সী ভারভারা রাওকে যদি এতো অসুস্থ অবস্থায়ও বন্দী করে রাখা হয়,তাহলে বিচারকালীন অবস্থাতেই তিনি জেলে মারা যাবেন।তিনি তাঁকে মুক্তি দেওয়ার দাবীও জানান।

সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হল এই যে,একদিকে দেশ যখন ৭২তম প্রজাতন্ত্র দিবস পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে,ঠিক সেই সময়েই অন্যদিকে দেশে অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এবং মানবাধিকার কর্মীদের উপর নিপীড়নের ঘটনা ঘটে চলেছে।ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সমগ্র বিশ্বের কাছে ভারতের মানহানির কারণ হয়ে উঠছে।

Vinkmag ad

Eastern Times

Read Previous

ট্র্যাক্টর মিছিলের পর কৃষকদের পরবর্তী কর্মসূচি ১ ফেব্রুয়ারি ‘সংসদ অভিযান’

Read Next

জয় শ্রীরাম!

Leave a comment

You have successfully subscribed to the newsletter

There was an error while trying to send your request. Please try again.

easterntimes will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.