Breaking News

সোনার ঘরে বন্দি সৌমিত্তির, যান, উড়িয়ে দিলাম আপনাকে

রূপায়ণ ভট্টাচার্য 

একবার ভাবি, কী করে মিন্টো পার্কের বেলভিউ নার্সিংহোমেই বাঙালি সংস্কৃতির সেরা নামগুলো চিরবিদায় নিয়েছেন। উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায় এবং এ বার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই নার্সিংহোমের এক একটি ঘর তাঁদের জীবনের শেষ কিছু মুহূর্তের সাক্ষী। নার্স এবং ডাক্তাররাও। বাঙালির স্মৃতি মন্দির হতে পারে সেই ঘরগুলো।উত্তমের ২১২টি, সুচিত্রার ৬১টি সিনেমার কথা শুনি। সৌমিত্রর ছবি উত্তমের তুলনায় আরও বেশি। হেমন্তর দু’হাজারের মতো গান। সত্যজিতের ৩৬ সিনেমা। সব কিছুর শেষ স্মৃতি ওই নারকেল গাছ ঘেরা ছোট পুকুরের ধারে রয়ে গেল।

আর একবার ভাবি, এই পুজোর উৎসবের আবহেই কত জন খ্যাতিমান বঙ্গসন্তানকে হারিয়ে ফেলল বাঙালি। মহালয়া থেকে কালীপুজোর মধ্যে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মান্না দে।

Soumitti a prisoner in the gold house go I blew you away

সৌমিত্র বেলভিউতে ভর্তি হওয়ার পর একদিন যখন রটে গিয়েছে, আর বেশি দিন নেই, তখন এক দুপুরে গিয়েছিলাম সেখানে। নার্সিংহোমের সামনে অনেকে বুম নিয়ে দাঁড়িয়ে। একটি সর্বভারতীয় চ্যানেলের গাড়ি দাঁড়িয়ে। এক তরুণী উত্তেজিত হয়ে বুম নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন।

সৌমিত্র এমন একদিন ঠিকানাহীন ঠিকানায় চলে গেলেন, বাঙালি প্রথম প্রায় শব্দহীন আলো দেখল দীপাবলিতে। এটাই হয়তো নিয়ম হয়ে যাবে এরপর। দীপাবলির পরের দুপুরের যে বাংলা সিনেমার সোনার যুগের শেষ আলোকময় সম্রাট হারিয়ে গেলেন নিরুদ্দেশে।

বছর পাঁচেক আগে সৌমিত্রকে নিয়ে একটা লেখা লিখতে গিয়ে শুরুটা করেছিলাম এ রকম।

সাম্প্রতিক অধিকাংশ লেখা পড়তে গেলেই রাগ হয়ে যায় খুব৷ বয়স বাড়ছে তো! প্রেসারের ওষুধ খেতে হয়৷ দপ করে জ্বলে ওঠে সৌমিত্রকে ঘিরে কঠিন কঠিন শব্দবন্ধগুলো দেখলে৷ এটার কী মানে? ওটার কী মানে? শব্দের শেকলে, জটিল বাক্যবন্ধে কিছুই যে বুঝতে পারি না৷ বাংলা ভাষাটা কী ভুলে গেলাম?

সৌমিত্রকে নিয়ে লিখতে গেলেই অমর্ত্য সেন বা মার্কোয়েসকে নিয়ে লেখার মতো কঠিন কঠিন বাক্য লিখতে হবে?

ভাবতে ভাবতে মনে হয়, বাঙালির প্রিয় অভিনেতাকে এঁরা যেন বন্ধ করে রেখেছেন একটা ঘরে৷ ইনি শুধু অপু, অমল, ফেলুদা, ক্ষিদ্দা বা শেষ বয়সের অসামান্য কিছু বৃদ্ধ চরিত্র নন। আরও বড় কিছু।

সৌমিত্র মানে সুমিত্রার পুত্র। লক্ষ্ণণ বা শত্রুঘ্ন। উত্তমকুমারকে রাম ভেবে সৌমিত্রকে লক্ষ্ণণকে ভাবা যায়। কিন্তু সেটা ভাবাও ঠিক নয়। অনেক অসামান্য ব্যাপ্তি, অনেক রং সৌমিত্রের শেষ বয়সের সিনেমায়। আর তাঁর মধ্য সময়ের বাণিজ্যিক সিনেমা তো তাঁর অন্য সিনেমার আড়ালেই পড়ে রইল।

Soumitti a prisoner in the gold house go I blew you away

পাঁচ বছর পর, কালীপুজোর পরের দুপুরে বাংলা সিনেমার শেষ সম্রাটের প্রয়াণের পর ওই কথাগুলো বদলানোর কোনও কারণ দেখছি না।

ছবিটা একই রকম থেকে গেল। সেখানে একটা কথাই বলে দেওয়া হয়েছিল সৌমিত্রকে। এবং প্রতিবাদহীন তিনি মেনে নিয়েছিলেন কথাগুলো।

যেন তাঁকে বলা হয়েছিল, আপনি এখানে বন্ধ থাকুন সৌমিত্রদা৷ এখান থেকে বেরোবেন না৷ আপনার জন্য একটা সোনার চেয়ার রেখে দিয়েছি৷ সোনার খাট৷ সোনার আলমারি৷ সোনার দেওয়াল, মেঝে৷ ওখানেই থাকুন আপনি৷ আপনি জনতার নন৷ আপনি বুদ্ধিজীবীদের৷ কবিদের৷ লেখকদের৷ নাট্যকারদের৷

এই সব ভাবগম্ভীর লেখায় সৌমিত্রকে শুধু সত্যজিত্‍‌ ‍-তপন সিংহ-মৃণাল সেনের সৌমিত্র করে রাখা হয়, নইলে একেবারে হাল আমলের সৌমিত্রকে৷ দেখা৷ অংশুমানের ছবি৷ নোবেল চোর৷ শূন্য অঙ্ক৷ হেমলক সোসাইটি৷ ভালো থেকো৷ ১৫ পার্ক এভিনিউ৷ পারমিতার একদিন৷ বালিগঞ্জ কোর্ট৷ সাঁঝবাতির রূপকথা৷ রূপকথা নয়৷

মাঝখানের বিশাল সমুদ্রের মতো সৌমিত্র সেখানে নেই৷ তাঁর মাঝখানের ছবিগুলোও নেই৷ যে ছবিগুলো কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার একটা সময় দেখেছে৷ সত্তর এবং আশির দশকের অসংখ্য বানিজ্য সফল সিনেমা!

নেই তো নেইই৷ ইউটিউবে নেই৷ টরেন্টসজে নেই৷ সমালোচকদের লেখায় নেই৷ এমনকী সৌমিত্রকে নিয়ে অসংখ্য সাক্ষাত্‍কারে তাঁর নিজস্ব কথাতেও নেই৷ অথচ সৌমিত্র চলে যাওয়ার রাতে ‘জীবনে কী পাব না ভুলেছি সে ভাবনা’ ইউটিউবে দেখে মনে হল,  কী চমৎকার টুইস্ট নেচেছিলেন সৌমিত্র।

Soumitti a prisoner in the gold house go I blew you away

টুইস্ট উত্তমকুমারও নেচেছিলেন রফির ‘ছোটি সি মুলাকাত সে প্যায়ার বন গয়ি’ গানে বৈজয়ন্তীমালার সঙ্গে। কিন্তু সেখানে ডামির ব্যবহার বোঝা যাচ্ছিল মাঝেমাঝে। সৌমিত্রর টুইস্ট তুলনায়অনেক নিখুঁত। অথচ  নিয়ে আলোচনা তেমন হয়ইনি। কবি, আঁকিয়ে, বামপন্থী সৌমিত্রর সঙ্গে কি টুইস্ট মানায়, এমন একটা ভাবনায় সেই দৃশ্য আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

অথচ জনতার সৌমিত্র হঠাত্‍ যেন ভ্যানিশ হয়ে যান৷ এমন কথাটা খাটে সত্যজিতের তিন বুদ্ধিদীপ্ত নায়িকা মাধবী, শর্মিলা, অপর্ণার ক্ষেত্রেও। অপর্ণাও যেন নিজের সফল বাণিজ্যক সিনেমাগুলো ভুলে গিয়েছেন। কদিন আগে এই সময় পত্রিকায় নিজের প্রিয় বাণিজ্যিক ছবির কথা বাছতে গিয়ে বসন্ত বিলাপ, ছুটির ফাঁদের মতো সামান্য কিছু কমেডি ছবির কথা বলেছিলেন। অন্য হিট ছবির কথা তোলেননি। ভুলেই গিয়েছেন হয়তো। সৌমিত্র যেমন ভুলে গিয়েছিলেন শেষ দিকে।

সেদিন মাঝরাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে টিভিতে দেখি একটা সৌমিত্র-সিনেমা চলছে৷ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘অগ্রদানী’৷ পরিচালক পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ অদ্ভূত কালো রং করে দেওয়া হয়েছে সৌমিত্রকে৷ দাঁত কালো৷

গ্রামের সরল বামুন সেজেছেন৷ তখনকার দিনে ভালো মেক আপের অত উপকরণ ছিল না ইন্দ্রপুরী বা এনটিওয়ান স্টুডিওয়৷ সেই মেকআপ সৌমিত্রর অনবদ্য এক্সপ্রেশনই ঢেকে গিয়ে চলে যাচ্ছে৷ সন্তান আসছে এমন খবর পেয়ে, গ্রামের নদীমাঠে সৌমিত্র গাইতে গাইতে যাচ্ছেন, ‘আমার বউ হবে মা, আমি হব বাপ’৷

কোথাও ব্যাপারটাকে হাস্যকর মনে হচ্ছে না৷ তাঁর সংলাপ, তাঁর অভিব্যক্তি এক অন্য উচ্চতায় তুলে দিয়ে যাচ্ছে অগ্রদানী বামুনকে৷

গ্রামীণ সারল্যর ব্রাক্ষ্মণ সৌমিত্রর ক’দিন বাদে টিভিতে দেখি, খলনায়ক সৌমিত্রকে৷ উত্তমকুমারও রয়েছেন সেই ছবিতে-প্রতিশোধ৷ সুখেন দাসের সে ছবিতে জমিদার উত্তমের সব সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছেন ভাই সৌমিত্র৷ সেখানে চোখে পড়ল, কোমর দুলিয়ে তরুণী ছিপছিপে অনামিকা সাহার চিবুক ধরে মদ্যপ সৌমিত্র গাইছেন, ‘কী বিষের ছোবল দিবি কালনাগিনী তুই/ আমারও যে বিষ আছে, বুঝবি যদি তুই/হাতে হাত প্রমাণ পাবি, কেমন করে হয়/ বিষে বিষে বিষক্ষয়’৷ সেখানে তাঁর চোখের চাহনির ক্রুরতায় ফুটে উঠছে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় যেন৷

দুটো ছবি বিবেককে নাড়িয়ে দিয়ে যায়৷ স্তম্ভিত আমি খুঁজতে থাকি সোনার ঘরে বন্দি রাখা সৌমিত্রর বাণিজ্যিক দিককে৷ ‘প্রণয় পাশা’ বা ‘ঝিন্দের বন্দি’ ছবিতে সৌমিত্রর ঝলমলে ভিলেনি মনে করেন অনেকে৷ সুচিত্রা সেনের বা তপন সিংহের ছবি বলেই৷ সুখেন দাসের ছবি বলে কি সৌমিত্রর প্রতিশোধের ভিলেনের অভিনয়ের কথা লোকে বলে না?

Soumitti a prisoner in the gold house go I blew you away

বিশ্বের অনেক পরিচালক তাঁর প্রথম দিকের ছবিকে অস্বীকার করে থাকেন৷ সৌমিত্র কি তাঁর আকাশ ছোঁয়া ফিল্মিজীবনের মাঝখানের ছবিগুলোকে ও ভাবে অস্বীকার করতেন? প্রশ্নটা নিজের মনে করি এবং ভাবি, এমন হওয়ার তো কোনও কারণ নেই৷ তথাকথিত জনপ্রিয় অজস্র ছবি করেছেন তিনি৷ ইদানীং যা ট্রেন্ড, সেই ছবিগুলো

এখন হলে পরিচালকরা যা প্রচার পেতেন, তাতে আজ মনে হত, ওঁরাই এক এক জন তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার৷ বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনা, স্টাইল কী করে বাণিজ্য সাফল্যের সঙ্গে মেশাতে হয়৷

সৌমিত্র ওই সব পরিচালকদের সিনেমাগুলো নিয়ে কথা বলে গেলে ওঁরাও গুরুত্ব পেতেন৷ পাননি৷ যেমন পাননি সৌমিত্রর অসামান্যা নায়িকারা৷ তনুজা বা শর্মিলা ঠাকুর এখন সৌমিত্রর জুটি হিসেবে যা গুরুত্ব বা প্রচার পান, তা অন্য নায়িকারাও পাননি৷

সৌমিত্র-অপর্ণা জুটি একটা সময় উত্তম-সু্চিত্রার বিকল্প হওয়ার সন্ধান দিয়েছিল৷ যাঁরা নিজেদের একটু ইন্টেলেকচুয়াল ভাবেন, উত্তম কুমারকে পাত্তা দিতে চাইতেন না, তাঁরা সৌমিত্র-অপর্ণার মধ্যে খুঁজতেন বিকল্প৷ সৌমিত্র-অপর্ণার কয়েকটা সত্তর দশকের ছবি দূরদর্শনে মাঝে মাঝে দেখলে রোমান্টিকতার সংজ্ঞা অন্য রকম লাগে৷ কয়েকটা নাম লিখি৷ অপরিচিত (১৯৬৯), পদ্মগোলাপ (১৯৭০), খুঁজে বেড়াই (১৯৭১), জীবন সৈকতে (১৯৭২), বসন্ত বিলাপ, বিলেত ফেরত, এপার ওপার (১৯৭৩), শেষ পৃষ্ঠায় দেখুন (১৯৭৩), অসতী (১৯৭৫), নিশিমৃগয়া (১৯৭৫), ছুটির ফাঁদে (১৯৭৫), নৌকোডুবি (১৯৭৯)৷ নায়ক নায়িকার চোখের চাহনি, ভ্রু ভঙ্গিমায় একেবারে অন্যরকম৷ জনপ্রিয় হয়েছিল সেগুলো৷ অথচ সে সব ভ্যানিশ৷ সত্তরের আগে সৌমিত্র-অপর্ণার তিনটি সিনেমা (তিন কন্যা, বাক্সবদল,আকাশ কুসুম) তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবি নয়৷

Soumitti a prisoner in the gold house go I blew you away

সেগুলো নিয়েই যা লেখালেখি৷ প্রবলতর সমস্যা হল, সৌমিত্রবাবুকে নিয়ে আলোচনায় বানিজ্যিক সব সিনেমার উল্লেখ পাই না৷ তাঁর ইন্টারভিউতেও না৷ অপর্ণা সেনের কথাবার্তাতেও এ সব সিনেমা সেভাবে ফিরে আসে না৷ ইউটিউবে যে বসন্ত বিলাপ ছাড়া অধিকাংশ ছবিই পাওয়া যায় না, তাকে দোষ দেব কী করে?

সৌমিত্র-সন্ধ্যা রায়, সৌমিত্র-সাবিত্রী, সৌমিত্র-সুমিত্রা মুখার্জি, সৌমিত্র-আরতি ভট্টাচার্য জুটির কি কম গৌরব গাথা ছিল? দর্পচূর্ণ, বাবুমশাই, স্ত্রী, প্রেয়সী ছবিতে সৌমিত্রর এক্সপ্রেশন মনে পড়ে খুব৷ তরুণ মজুমদারের সৌজন্যে, সৌমিত্র-সন্ধ্যা রায়ের অনেক ছবি স্নিগ্ধতার মাইলস্টোন হয়ে দাঁড়িয়ে বাংলা ছবিতে৷

এ ভাবেই পরপর চলে আসে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় সিনেমার গাঁথা মালা৷ তন্দ্রা বর্মণের সঙ্গে ‘অতল জলের আহ্বান’ ছবিতে কোট পরে সিগ্রেট ধরাচ্ছেন সৌমিত্র৷ ‘বর্ণালি’ ছবিতে শর্মিলা ঠাকুরের বাড়িতে ভুল করে বিয়ের নেমন্তন্ন করে আসার পরে সৌমিত্রর অপরাধ বোধে ভোগার দৃশ্য৷ চমত্‍কার৷ নাকের পাশে ওই ছোট তিলের সৌমিত্র!

নব্বই দশকে বাবা, কাকা বা দাদুর ভূমিকায় অসংখ্য গুরুত্বহীন বাণিজ্যিক ছবি করেছেন সৌমিত্র৷ না করলেও কিছু এসে যেত না৷ ওগুলো সৌমিত্র ভুলে যেতেই পারেন৷ কিন্তু নায়ক হওয়ার ছবিগুলো ভুলে যান কী ভাবে?

Soumitti a prisoner in the gold house go I blew you away

সৌমিত্র-সুমিত্রা জুটির মণিমাণিক্য ছড়িয়ে রয়েছে দেবদাস (১৯৭৯), সঙ্গিনী (১৯৭৪), দত্তা (১৯৭৬), গণদেবতা (১৯৭৯), নৌকাডুবি (১৯৭৯), প্রতিমা (১৯৭৭), সুদূর নীহারিকা (১৯৭৬), মন্ত্রমুগ্ধ (১৯৭৭), ঘরের বাইরে ঘর (১৯৮০)৷ বৈকুণ্ঠের উইল (১৯৮৫), অগ্রদানী (১৯৮৩), ইন্দিরা (১৯৮৩), রসময়ীর রসিকতা (১৯৮২), ফাদার (১৯৮১)৷ এই এক অভিনেত্রী-সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়৷ নিজেকে বারবার ভেঙেচুরে অসাধারণ সব জনপ্রিয় সিনেমা করে গিয়েছেন৷ অপর্ণা সেন এবং মহুয়া রায়চৌধুরীর মাঝখানের ব্যবধানে অসংখ্য জনপ্রিয় ছবিতে নায়িকা হয়েছেন৷ প্রাপ্য মর্যাদা পাননি৷ না সিনেমায়, না জীবনে৷ মনে আছে, সুমিত্রা মারা যাওয়ার পরে কলকাতার এক ইংরেজি দৈনিকে ভিতরের দিকে একটা ছবি বেরিয়েছিল৷

কোনও খবর নেই৷ শুধু একটা ছবি৷ সঙ্গে ক্যাপশন স্টোরি৷ ভাববেন না, সুমিত্রার ছবি৷ ছবিটায় দেখা যাচ্ছে, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় মারা যাওয়ায় গীতা দের সঙ্গে কাঁদছেন দুই বর্তমান নায়িকা৷ ওই বর্তমান নায়িকারা ছবিতে ছিলেন বলেই ওটা বেরিয়েছিল৷

সৌমিত্রর লিপে চমত্‍কার গান, সে সবও যেন উপেক্ষিত হয়ে দাঁড়িয়ে৷ সৌমিত্রর লিপে গানের কথা হলে দুটো তিনটে গানে এসে থেমে যায়৷ সত্যজিতের জন্য কিশোরকুমারের লিপে, ‘চিনি গো চিনি’, ‘বিধির বাঁধন’ প্রসঙ্গ আসে৷ মান্নার গলায় ‘হয়তো তোমারই জন্য’, ‘জীবনে কি পাবো না’ আসে৷ বড় জোর বসন্তবিলাপ ছবিটা নিয়মিত টিভিতে দেখানো হয় বলে ‘লেগেছে লেগেছে লেগেছে আগুন’ গানটাও সৌমিত্রর লিপে, এটা জানে অনেকে৷ বা ‘শহর থেকে আরও অনেক দূরে৷’ তার পরেই এক দৃশ্য৷

সেখানেও বন্দি করে রাখা হয় বাঙালির প্রিয় অভিনেতাকে৷ অথচ তাঁর লিপে জনপ্রিয় গান অসংখ্য৷ উত্তমের গানে লিপ দেওয়া নিয়ে এত ধন্যি ধন্যি রব, লিপটা সৌমিত্রও খারাপ দিতেন না৷ কিন্তু তাঁর তো উত্তমের মতো ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে’ গানের রেকর্ড নেই৷

কবিতার বই আছে৷ বামপন্থী বুদ্ধিজীবী৷ তাই ক্রিটিক ও পাব্লিক ধরে নিয়েছে, সৌমিত্র কী করে লিপ দেবেন গানে? অপর্ণা সেন সম্পর্কেও তাই। তিনিও সৌমিত্রের মতো বাণিজ্য সফল কমার্শিয়াল ছবি গুলো নিয়ে আর কথা বলেন না।

বলতে চান না। খুব সচেতন ভাবে এড়িয়ে যান। যেন ও গুলো করেনইনি।

ধরে নিন গে৷ কী করে ভুলি, ছুটির ফাঁদে ছবিতে অপর্ণা সেনের সঙ্গে সৌমিত্র চাটুজ্যে গাইছেন, ‘মুশকিল আসান, আমি এসে গেছি মুশকিল আসান’৷ জঙ্গলের মধ্যে সৌমিত্র প্রায় হামাগুড়ি দিতে দিতে গাইছেন উৎপল দত্তকে এড়িয়ে যেতে। সন্ধ্যা রায়ের সঙ্গে ‘মণিহার’ ছবিতে হেমন্তর গলায়, ‘কে যেন গো ডেকেছে আমায়’৷

‘প্রেয়সী’ সিনেমায় আরতি ভট্টাচার্যকে খুঁজতে গিয়ে নৌকোয় মদ্যপান করতে করতে গাইছেন মান্নার গলায়, ‘আজ বুঝেছি মজনু কেন পাগল হয়েছিল/আমার মতো সেও যে প্রেমের আঘাত সয়েছিল৷’ বা অপর্ণা সেনের সঙ্গে ‘শেষ পৃষ্ঠায় দেখুন’ ছবিতে মান্না দেরই গাওয়া, ‘এ কী এমন কথা, তারে বলা গেল না৷’ অপর্ণা সেনের সঙ্গে ইন্দিরা ছবি৷ দু’জনে বৃষ্টিতে ভিজছেন৷ সৌমিত্রর বেশ পুরোনো আমলের মতো।

Soumitti a prisoner in the gold house go I blew you away

আর সঙ্গে তাঁর লিপে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সুরে মান্নার গাওয়া, ‘ঝরঝর বৃষ্টিতে থরথর দৃষ্টি’৷ অজানা শপথ ছবিতে সাইকেল চালাতে চালাতে সৌমিত্র গাইছেন হেমন্তর বিখ্যাত গান, ‘ও আকাশ, সোনা সোনা৷’ বা আর একটু অন্য রকম ছবি৷ সাবিত্রী নায়িকা৷ সিনেমার নাম, ‘নতুন দিনের আলো৷’ সেখানে সৌমিত্র একবার গাইছেন, ‘রং রেরংয়ের জেল্লা, মার দিয়া হ্যায় কেল্লা/ছেঁড়া জামায় দেখে কে আমায়, পরেছি বাদশাহি আলখাল্লা৷’ আর একবার, ‘চলেছে চলছে চলবেই/ যা কৈলাশে জমে আছে বরফের স্ত্তপ হয়ে/ সে তো গঙ্গার স্রোত হয়ে গলবেই৷’ সোমা দে-র জন্য যেন ‘সুদূর নীহারিকা’ ছবিতে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রাতে সৌমিত্র গাইছেন, ‘কেন ডাকো মিছে পাপিয়া, ভুলে গেছে তোমারে কি পিয়া?’ কী চমৎকার গান। সে সব সৌমিত্র কখনও বলেননি কোনও সাক্ষাৎকারে। তাঁকে কেউ প্রশ্নও করেনি।

সেই অপরূপ সৌমিত্রকে আমি ভুলিনি৷ টিকোলো নাক৷ ডান দিকে নাকের পাশে একটা ছোট তিল৷ দীপ্ত এক জোড়া চোখে উপচে পড়ছে বুদ্ধিদীপ্ত মেধা৷ চুল আলগোছে পড়ছে কপালে৷ অপর্ণা, সুমিত্রা, সন্ধ্যাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে অপলকে৷ এই এক সৌমিত্রও জনতার অসম্ভব কাছের মানুষ ছিলেন৷ আছেন৷ থেকে গেলেন চিরদিনের মতো। কালীপুজো এলে তাঁকে মনে পড়বে আজ থেকে একশো বছর পরেও।

শুধু তিনি এক সোনার ঘরে বন্দি রয়ে গেলেন এক ইমেজ বজায় রাখার জন্য৷

( লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহিত )
Vinkmag ad

Eastern Times

Read Previous

এবার আমাদের পালা, আপনাকে আমাদের বুকের মাঝে বাঁচিয়ে রাখার

Read Next

সৌমিত্র কে শ্রদ্ধা ইস্টবেঙ্গলের

Leave a comment

You have successfully subscribed to the newsletter

There was an error while trying to send your request. Please try again.

easterntimes will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.