Breaking News

মাওবাদ অথবা সানি দেওলের সিনেমা

Maoism or Sunny Deol's movie

তাপস দাশ

দেশদ্রোহী আর দেশপ্রেমিক, এ দুয়ের মধ্যে বেছে নিতে বললে দেশের ক্ষমতাসীন শাসকদলের নেতা থেকে আইটি সেল কর্মী বা সমর্থকরা নিশ্চিত ভাবেই প্রথমটা বেছে নেবেন।

দেশদ্রোহী শব্দটি না থাকলে, তা যত্রতত্র ব্যবহার না করতে পারলে, নিজেদের যুক্তিজাল সাজাতেই সক্ষম হবে না তারা। যে কারণে, প্রতিবার ভোটের আগে, ভোটের সময়ে কোনও না কোনওভাবে সীমান্তে ঘটনা ঘটে, বা সীমান্তের ঘটনাবলীকে ভোটরঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলতে হয়। বিদ্রোহ দেখলে, বিপদের আঁচ পেলে, আন্দোলন চলাকালীন, বিজেপি ‘দেশদ্রোহ’ শব্দটির আড়ালে ইস্যুকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে।

এবারের কৃষক বিক্ষোভেও ওই ছক ব্যবহার করা শুরু হয়ে গিয়েছে। ধ্বনিটি তুলেছিলেন হরিয়ানার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর।

তিনি বলেছিলেন, কৃষক বিক্ষোভের পিছনে রয়েছে খালিস্তানিরা। এসব ধ্বনিতে সকলের আগে ধুয়ো ধরার যিনি, সেই কঙ্গনা রানাওয়াতের কথা ধর্তব্য নয়। তবে ধর্তব্যের মধ্যে আনতেই হবে যাঁকে, তিনি অমিত মালব্য।

বিজেপি আইটি সেলের এই শীর্ষনেতা এখন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্তও বটে। অমিত মালব্য আইটি সেলের প্রধান হিসেবে, আর এক কাঠি এগিয়ে গিয়েছেন।

শুধু খালিস্তানে তিনি ভরসা রাখতে পারেননি, তার কারণ সম্ভবত এ-ই যে, খালিস্তান সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের খুব কিছু জানা নেই। তিনি এই কৃষকবিক্ষোভের সঙ্গে মাওবাদী যোগের কথাও উল্লেখ করে ফেলেছেন। মাওবাদী তকমাটি মোটামুটিভাবে যে কোনও শাসকের পক্ষেই প্রিয়, কারণ মাওবাদ কেউ জানুক বা না জানুক, তা যে পরিহার্য, সমাজের পক্ষে অমঙ্গলকর, এবং বিশেষণ হিসেবেও তিরস্কার ও শাস্তিযোগ্য, তা প্রায় সকলকেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জেএনইউ থেকে শাহীনবাগ আন্দোলন, যে কোনও সময়ে, যখনই দেশের কর্তৃত্বে থাকা অতি দক্ষিণপন্থী দল বিপাকে পড়েছে, তারা মাওবাদী বা নকশাল ঢালটিকে বেছে নিয়েছে।

কারণ এ ভাবে দেশদ্রোহী প্রমাণ করা সহজসাধ্য, অন্তত এখন, এই পরিমণ্ডলে। এখন দেশপ্রেম মানে মোদীপ্রেম, অমিত শাহের প্রতি ভালোবাসা এবং হিন্দুত্ববাদকে আগলে রাখার দায়িত্বগ্রহণ।

 Maoism or Sunny Deol's movie

কিন্তু শুধু খালিস্তানের সঙ্গে এই আন্দোলনকে জুড়ে রেখে কেন নিশ্চিন্ত হতে পারল না বিজেপি? তার কারণ, খালিস্তান নিয়ে নাড়াচাড়া হলে, বিজেপির পক্ষে ব্যাপারটা খুব মসৃণ হবে না।

খালিস্তান আন্দোলন বা বিদ্রোহ যে পরাভূত, তা বিজেপি সরকার কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে, নিজেদের প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই। ২০১৯ সালে টানা দ্বিতীয়বার মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের যে Central Adverse List বা কেন্দ্রীয় প্রতিকূল তালিকা, তা থেকে খালিস্তানি আন্দোলনের সঙ্গে একসময়ে যুক্ত ছিলেন এমন ৩১২ জন ভিনদেশের বসবাসকারী শিখের নাম সরিয়ে নেওয়া হয়।

অর্থাৎ, ভারতের বাইরে বসবাসকারী এই ৩১২ জনকে দেশে ফেরার বিধিনিষেধ প্রত্যাহৃত হয়। এই তালিকায় আগে ৩১৪ জনের নাম ছিল।

গত শতাব্দীর ৮ ও ৯-এর দশকে যাঁরা খালিস্তান আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন এবং অপারেশন ব্লু স্টারের বিরোধিতা করেছিলেন, এই ৩১২ জন তাঁদের মধ্যেই পড়েন।

মনে রাখতে হবে, এই সিদ্ধান্তের পিছনে কোনও আইনগত বা বিচারবিভাগীয় চাপও ছিল না। ২০০১ সালে, এই পদক্ষেপের ১৮ বছর আগে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে খালিস্তান সমর্থক এক ব্যক্তির পাসপোর্ট ইস্যু করার নির্দেশ দিয়েছিল, এ ব্যতিরেকে এ ধরনের কোনও বিচারবিভাগীয় টানাপোড়েন হয়নি।

 

বিজেপির দ্বিতীয় অস্বস্তি শিরোমণি অকালি দলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ। মনোহর লাল খট্টরের খালিস্তান সম্পর্কিত বক্তব্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষকদের খালিস্তান যোগের বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয় অকালি দলের তরফ থেকে। আগের মাসেই কৃষি আইন কেন্দ্র করে শিরোমণি অকালি দল এনডিএ ছেড়েছিল।

পাঞ্জাবে বিজেপির অস্তিত্বের জন্য যে এখনও অকালি দলের সঙ্গ প্রয়োজন, তা বিজেপি নেতৃত্ব জানেন। এবং ইতিহাস সাক্ষী, খালিস্তানি আন্দোলনকে বিভিন্ন সময়ে সমর্থন জুগিয়েছে শিরোমণি অকালি দল।

খালিস্তান আন্দোলনের নাম করে এ নদী পার হওয়ার ব্যাপারে বিজেপির সবচেয়ে বড় ও জটিল সমস্যা, ধর্মরাজনীতিই তাদের অন্যতম সম্বল।

খালিস্তান আন্দোলন ছিল শিখদের পৃথক ভূমির জন্য আন্দোলন। শিখ ধর্মের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের বৈরিতার কথা বর্তমান হিন্দুত্ববাদীরা বলেন না। তাঁরা বরং বিভিন্ন সময়ে শিখ ধর্মকে আত্মস্থ করতে চেয়েছেন।

শিখ ও হিন্দু ধর্ম যে একই পথের পথিক, সে কথা বারবার বলতে চাওয়া হয়েছে। যে আত্তীকরণ প্রচেষ্টার প্রতিবাদ উঠেছে শিখ ধর্ম নিয়ে অ্যাকাডেমিক চর্চাকারীদের মধ্যে থেকেই। যে ধর্মকে এত নিকট বলে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, তাকে রাতারাতি শত্রুধর্ম হিসেবে দেখানোয় সমস্যা বিস্তর।

 Maoism or Sunny Deol's movie

সে সমস্যা আরও বাড়ে যখন বিজেপির অন্যতম তুরুপের তাস, ধর্মবিভাজন রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার নাগরিকত্ব আইনের দিকে যদি একবার নজর দেওয়া হয়। এই আইনে প্রতিবেশী দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘিষ্ঠতার কারণে অত্যাচারিত যেসব ধর্মবালম্বীকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, শিখ ধর্ম তার অন্যতম।

ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির কর্তৃত্বমূলক যে ধারা, সেখানে দেশপ্রেমের সঙ্গে ধর্মকে মিলিয়েই দেওয়া হয়ে থাকে। এ ধারার অন্যতম বৈশিষ্ট্য পাকিস্তান বিরোধিতা। জনপ্রিয় দেশপ্রেমী ছায়াছবির অন্যতম নায়করা পাক বিরোধী শিখ ধর্মাবলম্বী হিসেবে চিত্রায়িত হয়ে থাকেন। এই ডিসকোর্সকে হঠাৎ ১৮০ ডিগ্রি পাল্টে ফেলা অসম্ভব।

তেমনটা করতে গেলে হয়ত কোনও নায়ক টিউবওয়েল উপড়ে নিয়ে স্বপ্নে তেড়ে আসবেন কোনও জাঠ মন্ত্রীর দিকে। তেমন বিপদে পড়ার চেয়ে মাওবাদের কম্বলটির আড়ালে যাওয়াই যে ভাল, শীতের দিল্লিতে তা ঠাহর করতে পেরেছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। অমিত মালব্য তাই পাঞ্জাবের ধনী কৃষকদেরও মাওবাদী ঠাওরাতে শুরু করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

Vinkmag ad

Eastern Times

Read Previous

দলের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন আর এক তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক

Read Next

সরকারের সঙ্গে বৈঠকে রফাসূত্র মিলল না, কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে অনড় বিক্ষোভকারী কৃষকরা

Leave a comment

You have successfully subscribed to the newsletter

There was an error while trying to send your request. Please try again.

easterntimes will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.