Breaking News

কম্পিউটার হানা ও দেশদ্রোহ

Computer attacks and treason bhima koregaon case

তাপস দাশ

প্রধানমন্ত্রী হত্যার ষড়যন্ত্রের যে চিঠি জেলে আটক সমাজকর্মী রোনা উইলসনের কম্পিউটার থেকে পাওয়া গিয়েছিল, সে চিঠি তাঁর ল্যাপটপে রেখে দিয়েছিল কম্পিউটার হ্যাকার। দীর্ঘ ২২ মাস ধরে রোনা উইলসনের কম্পিউটার হ্যাক করে রাখা ছিল। শুধু ওই চিঠিই নয়, আরও বেশ কিছু আপত্তিকর নথি তাঁর ল্যাপটপে প্ল্যান্ট করেছিল হ্যাকার।

কোনও থ্রিলার সিরিজ নয়, এমনটাই ঘটেছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত সংবাদে জানা গিয়েছে। ম্যাসাচুসেটসের আর্সেনাল কনসাল্টিং নামের এক ডিজিটাল ফরেনসিক সংস্থা তাদের পরীক্ষায় এই তথ্য পেয়েছে। রোনা উইলসনের আইনজীবীদের অনুরোধে, তারা এই ফরেনসিক পরীক্ষা করেছে।

আর্সেনালের রিপোর্ট প্রকাশের আগে ওয়াশিংটন পোস্ট পর্যালোচনা করার পরেই সে সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করেছে। তিনজন বিশেষজ্ঞ আর্সেনালের কাছ থেকে পাওয়া রিপোর্ট খতিয়ে দেখেছেন এবং তা যথার্থ বলে মত প্রকাশ করেছেন।

কী করে এমন হল, সে ঘটনাবলী, যে কোনও থ্রিলার ওয়েব সিরিজকে হার মানানোর মত। ২০১৬ সালের এক বিকেলে এক বিশ্বস্ত সমাজকর্মীর কাছ থেকে বেশ কয়েকটি ই মেল পান রোনা উইলসন।

জনতা নয়, ক্যাডার:তাপস দাশ >>

সেই বন্ধু তাঁকে অনুরোধ করেন, একটি লিংকে ক্লিক করে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কিছু নথি ডাউনলোড করতে। ওই লিংকেই ছিল NetWire নামের এক বাজারচালু ম্যালওয়ার, যার মাধ্যমে রোনা উইলসনের কম্পিউটারের হদিশ পেয়ে যায় হ্যাকার।

ওই ম্যালওয়ার থেকে রোনা উইলসনের কিস্ট্রোক, পাসওয়ার্ড এবং তাঁর ব্রাউজিংয়ের ধরন- সবই জেনে ফেলে হ্যাকার। এর পর রোনার ল্যাপটপে অন্তত ১০টি আপত্তিকর চিঠি প্ল্যান্ট করা হয়।

মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের সাম্প্রতিকতম ভার্সন ব্যবহার করে ওই নথিগুলি লিখিত হয়। এই সব লুকোনো ফোল্ডারগুলি কোনও সময়েই খোলা হয়নি বলে আর্সেনালের পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। আর্সেনালের তরফে জানান হয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটিই অতীব সংগঠিত উপায়ে এবং অত্যন্ত অসদুদ্দেশ্যে করা হয়েছে। সংস্থা এই পরীক্ষায় মোট ৩০০ ঘন্টা সময় ব্যয় করেছে বলে আর্সেনালের তরফে জানান হয়েছে।

আর্সেনাল সংস্থা জানিয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতায় তথ্যপ্রমাণ বদল করার জন্য ম্যালওয়ারের ব্যবহার অতীব দুর্লভ। শুধু রোনা উইলসনই নন, এলগার পরিষদ মামলায় অভিযুক্ত আরও কয়েকজনের কম্পিউটারে এ ধরনের হ্যাকার হানা ঘটানো হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আধিকারিক, এন আই এ-র আধিকারিক, রাষ্ট্রীয় সকল পক্ষ থেকেই এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের আধিকারিকের বয়ান উদ্ধৃত করা হয়েছে, পুনের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে যে পরীক্ষা করা হয়েছে, তাতে রোনার ল্যাপটপে কোনও হ্যাকিংয়ের ঘটনার প্রমাণ মেলেনি।

হিন্দুতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে এন আই এ মুখপাত্র জয়া রায়কে। তিনিও বলেছেন, সরকারি কর্তৃপক্ষ যে সব ফরেনসিক পরীক্ষা করেছে, তাতে হ্যাকিং ও নথি প্ল্যান্টের প্রমাণ মেলেনি।

সরকার, যারা রোনাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহী তকমা দিতে চেয়ে গ্রেফতার করেছে, তাদের অধীন কোনও সংস্থার পরীক্ষায় এ ধরনের হ্যাকিংয়ের প্রমাণ মিলবে না, এমনটাই স্বাভাবিক। ভারতীয় সংস্থাগুলি এখনও তত স্বাধীন হয়ে ওঠেনি।

এ প্রসঙ্গে আমরা প্রায় এক দশক আগের একটি ঘটনা বা একাধিক ঘটনাপ্রবাহের কথা মনে করতে পারি। যে ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে ছিলেন ডক্টর মালিনী নামের এক আধিকারিক। তিনি ছিলেন বেঙ্গালুরুর ফরেনসিক ইনস্টিট্যুটের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। তাঁর কাজকর্মের জন্য তিনি কুখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন ডক্টর নার্কো নামে।

২০১২ সালে মিলি গেজেট পত্রিকার সম্পাদক মুম্বই সেন্ট্রাল জেলের আন্ডা সেল থেকে একটি চিঠি পান। চিঠির প্রেরক ছিলেন এহতেশাম কুতুব। কুতুব ছিলেন মুম্বই ট্রেন বিস্ফোরণে অভিযুক্ত। ওই চিঠিতে কুতুব লিখেছিলেন, আদালতের বা অভিযুক্তের কোনও রকম অনুমতি ছাড়াই নার্কো অ্যানালিসিস পরীক্ষা করা হত অভিযুক্তদের।

এহতেশাম জানিয়েছিলেন, ৫ অগাস্ট ২০০৬ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালের মধ্যে মোট চারবার তাঁর নার্কো অ্যানালিসিস পরীক্ষা হয়।

এই পরীক্ষার সময়ে তাঁদের শরীরে নিষিদ্ধ ওষুধ সোডিয়াম পেন্থানল ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হত। শুধু তাই নয়, প্রশ্নোত্তরগুলিকে পাল্টে দেওয়া হত। যেমন, প্রশ্ন করা হল ৬ এর পর কী? উত্তরে ৭ বলতেন অভিযুক্ত। এবার সে কথোপকথন যখন প্রমাণ আকারে পেশ করা হত, তখন অভিযুক্ত দেখতেন, প্রশ্ন – কটা বোমা রাখা হয়েছিল উত্তর – সাত।

এলগার পরিষদ মামলায় যে ১৬ জন গ্রেফতার হয়ে রয়েছেন, তাঁদের অন্যতম অরুণ ফেরেরাও আগের বার জেলে থাকাকালীন ডক্টর মালিনীর সঙ্গে তাঁর মোলাকাতের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, নার্কো অ্যানালিসিসের সময়ে ডক্টর মালিনী তাঁকে থাপ্পড় মারতেন, গালাগাল দিতেন, প্লায়ার দিয়ে কান মুচড়ে দিতেন, এমনকী ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে অজ্ঞানও করে দিতেন। ২০০৯ সালে মালিনীর চাকরি যায়। সে সময়ে বিভিন্ন সরকারি তদন্ত সংস্থার প্রায় ৪০০ মামলা তাঁর ‘বিশেষজ্ঞের ভূমিকা’র জন্য অপেক্ষমান ছিল।

মালিনীর মত ব্যক্তির প্রতি সরকারি তদন্তসংস্থাগুলির এই নির্ভরতার পরিমাণ প্রমাণ করে দেয় তাদের আনীত প্রমাণাদি ঠিক কতটা নির্ভরযোগ্য।

রোনা উইলসনের ল্যাপটপ থেকে পাওয়া নথি, এলগার পরিষদ মামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অন্যতম প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয়েছে। সেই নথি হ্যাকার দ্বারা ল্যাপটপে রাখা হয়েছিল, এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর স্বভাবতই শোরগোল উঠেছে। মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমরা প্রথম দিন থেকেই বলে আসছিলাম, পুরোটাই সাজানো মামলা।

অভিযুক্তদের অনেকেই এলগার পরিষদের ডাকা সভাতেই ছিলেন না। বিপরীতে , যে হিন্দুত্ববাদীরা হিংসা ঘটালো, তারাই রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাচ্ছে, আর, যাঁরা দশকের পর দশক জুড়ে অবদমিত, আক্রান্ত মানুষের অধিকারের সপক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের দু বছরের বেশি সময় ধরে আটক রেখেছে; উদ্দেশ্য, জেলেই পচিয়ে মারা। আমরা এই ১৬জনের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।”

২০১৬ সালে এক তুর্কি সাংবাদিকের কম্পিউটারে হ্যাক করে নথি প্ল্যান্ট করার প্রমাণ হাজির করেছিল রোনার ল্যাপটপ কাণ্ডের বিশ্লেষণকারী সংস্থা আর্সেনাল। সেই সাংবাদিক ও তাঁরসহযোগীরা এখন সকলে মুক্ত।

রোনা উইলসন সহ ১৬ জনের ভবিষ্যৎ তেমন হবে কিনা, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে এনআইএ বা কোনও সরকারি সংস্থারতদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা ফের একবার বিশ্বের দরবারে ধাক্কা খেল।

Vinkmag ad

Eastern Times

Read Previous

বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের বিনামূল্যে টিকা দিচ্ছে বাংলাদেশ, প্রথমদিনে স্বস্ত্রীক টিকা নেন ভারতের রাষ্ট্রদূত দোরাইস্বামী

Read Next

নবান্ন অভিযান ঘিরে ধুন্ধুমার, শুক্রবার ধর্মঘটের ডাক

One Comment

  • চমৎকার!

Leave a comment

You have successfully subscribed to the newsletter

There was an error while trying to send your request. Please try again.

easterntimes will use the information you provide on this form to be in touch with you and to provide updates and marketing.
%d bloggers like this: